লা দলচে ভিতা
ভাসে; যার ভার নেই কোনও, ঘাটও নেই, মান্দাস যেমন, যেন এই দূর থেকে
দেখাই আসল। কোথাও থাকার টান রয়ে যাওয়া মানে তার নিজেকেই ভালোবেসে ফেলা;
একটি কাচের ভাঙা টুকরোয় যে আকাশ দেখা যায়, তা সত্যি নয়, শুধু
একটি আকাশের মতো কিছু, সে আকাশ থেকে কোনও বৃষ্টিপাত হবে না কখনও।
নদীতে আকাশ নয়, পড়ে থাকে আকাশের অসংখ্য আকাশ,–
ভাসে তারা, নক্ষত্রমণ্ডলী ভাসে, উল্কাপাত ভাসে, মাঝেমাঝে ভেসে যায় ঘুড়ি ও বিমান।
মেঘে ঢাকা তারা
এইভাবে চলতে চলতে একদিন আমাদেরও সূর্যোদয় হবে।
আমরা আবার একে অপরের বুকের ভেতর মুখ রাখতে পারব,–
খুলে দেব জানলা। হাওয়া চলাচল করতে পারে এমন সব বাড়ি
তাদের দরজা খুলে দেবে সকলের জন্য। এইভাবে চলতে চলতে
ফুল ফোটাতে পারব আমরা; সূর্য, মৃত্যুভয় দূর করে, বিশ্বাস করো,–
রাতের আলোয় আমরা মায়াবী শিশির হয়ে যাই। এখন অনেক রাত।
আশাবাদে থাকো। একটিই জীবন, তার ছোট একটা ঘর থেকে
বড় কোনও ঘরে যাওয়া যায়। হয় দরজা খোল, নয়, নিজেকে অনেক
ছোট করে ফেল আরও, এ পথেই সূর্য আসে, একদিন আমাদেরও
জানলা খোলে, হাওয়া আসে। ঘাম শুকোনর মতো রাত্রি ছেড়ে যায়।
এইভাবে চলতে চলতে একদিন আমাদেরও সূর্যোদয় হয়।
শার্লক হোমস
আমার সমস্ত ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সে বসে থাকে, আমার অচেনা নয় কেউ
তবু সে চেনাও নয়, খুব ব্যক্তিগত কিছু চিঠি খুঁজতে এসে সে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ডুবে যায়
আমি তাকে সাবধান করি। বলি, এত উচ্চাকাঙ্খী হওয়া ভাল নয়, বলি, ফিরে এসো–
সে এলোমেলো করতে থাকে সব মাটি পাথর নদী, বাজার, টেলিফোন বিল এবং ক্যালেন্ডার।
যেন কেউ লুকিয়ে বসে আছে অনেকদিন। অথবা রয়েছে কোনও প্রাণভোমরা, স্বরলিপির খাতা, আমি যাকে
নিজের বলে ভাবিনি কখনও; আমার সমস্ত ধ্বংসস্তূপে সে বসে থাকে, আবর্জনা থেকে তুলে আনে
চল্লিশ বছর আগের কোনও চাইনিজ পেন, ভাবি, সংক্রামক ব্যাধি হল কিনা, ভাবি কেন তাকে কেউ
ডাকছেনা কোনও ছুতোয়,– অথবা বৃষ্টি পড়ছে না, – বিমানহানাও তো হতে পারত, কিংবা নীলাম
সে ভ্রুক্ষেপ করে না, যেন উদাসীন গোয়েন্দা এক, আমার হাতের ছাপ না নিয়ে যাবে না…
নাগরিক
একটি কবিতা যেন্ লেখা হবে কোনও, এমনভাবে অপেক্ষা করছে ভোরবেলার সদর দরজা,-
পুরনো পাড়ার গায়ে মাথা রেখে পুড়ে যাচ্ছে উনুন। তার ধোঁয়য় মানুষ আশাবাদী ।
এটাই আমার প্রকৃতি অংশুমান, অনেক উঁচু থেকে লক্ষ করে যায় জীবনানন্দের চিল
হরি ঘোষ স্ট্রিটের মতো নির্বিকার কিছু লোক রকে বসে, ভাবে সাম্যবাদ এসেছিল একদিন,-
আবার কখনও ফিরবে, – হাতে টানা রিক্সা যেন, যেন থিয়েটারপাড়া…
একটি কবিতা যেন লেখা হবে কোনও, এমনভাবে চালু হয় মধ্যরাতে লেটারপ্রেসের মেশিন
ধূসর চশমা পরে একটি লোক খুঁটে খুঁটে বেছে নেয় আমাদের বর্ণমালাগুলো।
প্রচারবিমুখ কিছু বারান্দায় শুকোয় জীবন…যেন কৌতূহলটুকুই ছিল তোমার, আমার।
দুদিকেই দুটি মুখ যে কোনও রাস্তার, তবু হরি ঘোষ স্ট্রিট
নিজের ভিতর দিকে ঘুরে ঘুরে দুঃখ পেতে থাকে।
স্টকার
বিকেলবেলার রাস্তাঘাট, তোমাকে এগিয়ে দেব ভেবে এতদূর এসে পড়লাম।
এখন কি পিছু হাঁটব আবার? আমাদের কোনও ভালোবাসাই সংসার হল না,–
এ নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই। ভবিতব্য এটাই। বিধি হাসছেন। রাজনীতি ছাড়া
একটি শব্দও সম্ভব না, এ নিয়ে তর্ক করতে করতে ঝাঁপ বন্ধ করল রাতের বাজার…
হয়তো দক্ষিণ থেকে এইবার ছুটে আসবে হাওয়া। দূরে যে চায়ের দোকান,
তিনি সম্ভবত ঈশ্বর। একটু কি জিরিয়ে নেব তবে? অন্ধকার নিয়ে আর একটিও কথা
বলব না আমরা। যে রাস্তা যাইনি, তা তৈরিই হয়নি এখনও। এখন রান্নার গন্ধ বড় ভাল
লাগে। বুঝতে পারি, এমন একটা ভাষায় আমরা এবার কথা বলব। রাস্তা কোনও গৃহী নয়,
সন্ন্যাসীও নয়। আচমকাই শুরু হয়েছ, আচমকাই শেষ হয়ে যাবে। তোমায় এগিয়ে দেব
ভেবে আমিও এতদূর এসে পড়লাম। এ নিয়ে আমরা ঠাট্টা তামাশা করতে পারি বড়জোর।
রাজনীতির মতো দেখতে কিছু পোস্টার উড়বে হাওয়ায়। ওরা বেওয়ারিশ। কোথাও যায় না।
দ্য ইডিয়ট
আমার থেকেও বোকা একটা লোক
আমাকেই লক্ষ করে যায়।
সে আমার সবটুকু জানে। জানে, সেই সবও,-
যা যা আমি কখনও বুঝিনি।
আমি তাকে খুঁজি, সেও বোঝে
সে আমায় কখনও খোঁজে না
আমার থেকেও বোকা একটা লোক
আমাকেই লক্ষ করে যায়
কখনও নিশ্চিন্ত লাগে, কখনও অস্থির
সে আমায় জানে, তবু
আমি তার কিছুই জানি না
হিন্দোল ভট্টাচার্য
জন্ম ২ জুলাই, ১৯৭৭। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনো। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার ও মুক্ত-সাংবাদিক। নয়ের দশক থেকেই বাংলা কবিতায় এক উল্লেখযোগ্য নাম। প্রথম কাব্যগ্রন্থ – হাওয়ার জ্যামিতি (২০০০)। গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ – তুমি, অরক্ষিত (২০০২), আবার হেমন্তকাল (২০০৬), তারামণির হার (২০০৮), জগৎগৌরী কাব্য (২০০৯), মেডুসার চোখ (২০১২), ব্যক্তিগত নির্বাসন থেকে (২০১৩), মিথ ও ঈশ্বর (২০১৪), তালপাতার পুথি (২০১৫), লেখ আলো, লেখ অন্ধকার (২০১৭), যে গান রাতের (২০১৮) এবং তৃতীয় নয়নে জাগো (২০১৮), রুদ্রবীণা বাজো (২০১৯) এবং অনিবার্য কারণবশত (২০১৯)। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে একটি গল্প সংকলন – সব গল্প কাল্পনিক (২০১৬) এবং মোংপো লামার গল্প (২০১৭)। উপন্যাস- সম্প্রতি প্রকাশিত। সোপান থেকে। নাশকতার বারান্দা (২০১৯) দেশ, কৃত্তিবাস, অনুষ্টুপ, বারোমাস সহ একাধিক কাগজে নিয়মিত লেখালেখি। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প ছাড়াও সাহিত্য আকাদেমির হয়ে অংশগ্রহণ করেছেন জার্মান-বাংলা কবিতা অনুবাদের ওয়ার্কশপে। এছাড়াও কাজ করেছেন গারো কবিতা নিয়ে। ৩০০ বছরের জার্মান কবিতার অনুবাদের কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। জগৎগৌরী কাব্যের জন্য ২০০৯ সালে পেয়েছেন বীরেন্দ্র পুরস্কার। যে গান রাতের কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা অকাদেমী পুরস্কার (২০১৮) লেখালেখি ছাড়াও তাঁর নেশা ভ্রমণ, ফিল্ম এবং বই।
এ পাগলই জানে আকাশকে দিয়ে কবিতা লেখাতে! বুক ভরা কবিতা।
খুব ভাল লাগলো কবিতাগুলো
প্রতিটি কবিতাই অসম্ভব ভাল । সবেচেয়ে ভাল লাগল ‘লা দলচে ভিতা’, ‘স্টকার’, ‘নাগরিক’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ‘শার্লক হোমস’ । কবিতাগুলো এপিফ্যানি খুব গভীর । সরলভাষ্যে কাব্যদর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছ । ভাল লাগল বেশ ।
‘একটিই জীবন, তার ছোট একটা ঘর থেকে বড় কোন ঘরে যাওয়া যায়’…
অনেক বিস্ময়ের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেল এই কয়েকটি কবিতা! অনেক টুকরো ছবি যেন উড়ে বেড়ায়! একটুখানি পড়ে, খানিকটা জিরিয়ে, আবার পড়া শুরু করে-এভাবে অনেকক্ষণ ধরে পড়ে যেতে হয় কবিতাগুলো।
ভালো লাগলো
আহা, কীসব কবিতা লিখেছিস হিন্দোল। সহসা তারুণ্য ফিরে পেলাম কিছুক্ষণের জন্যে। ফিরে গেলাম আমাদের যুবক বয়সে, সেই লেটারপ্রেসের দিনগুলোতে। লেটারপ্রেস নিয়ে তোর কবিতার লাইনটা চাই প্রবাদবাক্যের মতো অমর হোক। প্রতিটা কবিতাই ভালো লেগেছে। প্রতিটা কবিতাই ডানা মেলে উড়ছে আকাশ জুড়ে।
চমৎকার। সহজভাবে গভীর কথাগুলো বলা হয়েছে। এরকম ইতিবাচক কবিতা পড়ে ভালো লাগে বেশ।
আপনার লেখা আমার ভালো লাগে। এবারও অন্যথা হয়নি। বেশ কয়েকটি লাইন দাগ কেটে রইল। আরও লিখুন। শুভেচ্ছা, শুভকামনা রইল।
প্রতিটি লেখাই খুব ভালো লাগলো। শিরোনামের সঙ্গে আমি নিজের মতো করে একটি সংযোগ পেলাম।
খুব সুন্দর লেখা,ধন্যবাদ আপনাকে।
নিশীথ ষড়ঙ্গী, বাঁকুড়া
খুব সুন্দর লেখা, অনেক ধন্যবাদ
নিশীথ ষড়ংগী,বাঁকুড়া।
প্রতিটি কবিতাই খুব সুন্দর। inexplicable thoughts এর বিস্ফোরণ। একটা থাকা যেন একটা না থাকা কে জড়িয়েছে। যেন একটা স্পেস শুয়ে আছে একটা ভ্যাকুয়াম এর সাথে। একটা চলমান ঘড়ি তাকিয়ে আছে একটা বন্ধ ঘড়ির দিকে।