সূর্য উঠবেই
আলোর শহর তেমনি সম্মোহক, শুধু উধাও
জীবনের তাপ-উত্তাপ, অন্ধকার কোণাগুলো
ঝুম নির্জন, আলো অন্ধকারের পরিক্রমায়
রাত্রির বয়স বাড়ে, আমাদেরও, এবং ক্রমশ:
আমরা দূরের হয়ে যাই, দূর হতে চায় নিকট…
খুঁড়ে খুঁড়ে নামি পাতাল গহন, অচেনা মনন!
আমাদের খোলা জানালায় পাখি এসে বসে!
উদ্দীপ্ত লতাগুল্মের ঝেঁপে আসা আলিঙ্গনে
আমাদের চোখে দল মেলে সবুজ মায়া…
খুব ধীরে ধীরে আমরা সূক্ষ্ম শেকড় ছড়াই,
ক্রমান্বয়ে শিখে নিতে চাই ক্লোরোফিল কাব্য,
একেকটা একলা বৃক্ষের মত, রুদ্ধ অন্তঃপুরে!
আস্তে আস্তে মরিচা পড়তে থাকে দরোজায়
তালা চাবির ব্যবহার তামাদি, আজকাল তুমি
আরো গাঢ় স্বরে কথা বলো, আমি টের পাই!
তুমিও কী সেই ভয় পাও, ঠিক যেমনটা আমি?
দেখা হবে, কী হবে না হয়তো আর কোনদিন?
হাল ছেড়ো না, দিগন্তে রাখো চোখ, সূর্য উঠবেই!
বুঝি এলো সে
এমন গ্রীষ্ম দিনে তুমি
শোনাতেই পারো তীব্র তাপ দাহের গল্প
আমার শহরও দিনমান
পুড়েছে খর তাপে…
আবহাওয়া বিভাগ চিরকুট পাঠিয়েছে
আজ রাতভর বৃষ্টি আর বজ্রের ঐকতান!
সূর্যাস্তকালে পাখি বয়ানে
সুরেলা মাত্রা তুলো-মেঘের লহরে লহরে
ব্যাক ইয়ার্ডে হালকা হাওয়ার পেইন্ট ব্রাশ…
শখের লাউডগা মাথা দুলিয়ে বলবে,
বেশ, এবার ঘরে যাও তো, সন্ধ্যে হলো যে!
চেতনায় নাড়া পোড়া ঘ্রাণ মেশা সন্ধ্যা…
ম’ ম’ কফি সুবাস ডেকে আনছে বর্তমানে
এমন চরাচর ছাপিয়ে নামা সন্ধ্যে বেলায়
শুনশান নেমে আসা সন্ধ্যেকেই শুনতে হয়,
আর কিছু নয়, কান পাতো, শুনছো?
ওই দেখো বজ্র চমকায়,
দমকা হাওয়ায় মেঘ মল্লার, বুঝি এলো সে!
অন্য পায়ে
আমার চিলতে পৃথিবীটা বারোমাসি গায়
বারো মাস এক তাল, এক লয়, একই সুর
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা নামের বাহার নিয়ে আসে যায়…
আকাশ চিরায়ত নীল, সব ঋতুতেই
ঘাসের সবুজে নেই কোন হেরফের
আমি শুধু হেঁটে চলে যাই, ফিরে চলে যাই…
বিমূর্ত কবিতা ঝরে পায়ের ছাপে ছাপে
শিশির ঝরে টুপটাপ একান্ত নিশ্চুপে,
নির্জন সে ধুলিলিপির কবোষ্ণ নরম বুকে…
হাঁটবে এসো, পাশ কাটিয়ে মাইলফলক
অন্য পায়ে ফেরা কিংবা হারানো, তুমি চাইলেই
তোমার কবিতারা সাজবে সেদিন বিমূর্ত কারুকাজে!
শুদ্ধ করো হে নদী
শ্রাবণ দিনের স্ফটিক নদী
আঁজলায় জল অথৈ তৃষ্ণায়
পানকৌড়ির ভেজা পাখসাট
কার্পাস ফুল স্রোতে ভেসে যায়!
নদীর আয়ুরেখায় প্রাণ স্পন্দন
গতি খুঁজে পায় নতুন মেখলায়
চোখের জলে মিশিয়ে বলি
যমুনা, তুমি কাঁদাবে আমায়?
আমাকে শুদ্ধ কর হে নদী
শুদ্ধ করে দাও সমুদ্দুর আমায়
তিনভাগ জল, শুদ্ধ করে দাও
গ্রহণের এই বেলা শুদ্ধ হয়ে যাই!
জ্যোৎস্না বেসামাল
অলক্ষ্যে ভরে ওঠে ইনবক্স, ভয়েস মেইল!
সন্তর্পণে জমাট বাঁধে বিমূর্ত নকশী বুনন!
ঘনঘোর বরিষণ ভেজাচ্ছে অবেলায়!
হাওয়ার ভেতর বাজছে হার্প এর সিম্ফনি
তিরতির ঢেউ আলগোছে আছড়ে পড়ে শ্রবণে!
বিস্মৃত অপেক্ষা নোঙর ফেলে নির্জন জেটিতে…
উদ্দেশ্যহীন নাবিক পাল নামিয়ে উজানে…
দূরাগত বেলাভূমির হাতছানিতে মাহেন্দ্রক্ষণ!
একটা কিশোরী উচ্ছলতা অবরোধ ভেঙে
চক্রবাল ছোঁবে বলে পথে নামলো সদর পেরিয়ে
বোহেমিয়ান পথ বেঁধে নিলো আনকোরা একতারা…
চাঁদের গায়ে আলোর ঝরোখা, জ্যোৎস্না বেসামাল!
লুবনা ইয়াসমিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। প্রিয় কবি আবুল হাসান, প্রিয় লেখক পাওলো কোয়েলো।
বর্তমান আবাস কানাডার অন্টারিও প্রভিন্সের টরণ্টো শহরে। তবে লুবনা ইয়াসমিন এর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে ঢাকা শহরে। সবচে’ প্রিয় বন্ধু প্রকৃতির নিবিড় সাহচর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করেন, উদযাপন করেন নিয়ত।
তাঁর কাছে কবিতা লেখা হয়তো কখনো কখনো নিজের সাথে কথা বলা, হৃদয়ের কথা বলা, আর কখনো কখনো শব্দ, ছন্দের বিন্যাসে একটা সৃষ্টিশীল ভাষার কোলাজ বোনা।